শিক্ষা খাতে বাংলাদেশের অতি সামান্য ব্যয়

জাহাঙ্গীর কবির আহম্মদ

শিক্ষাকে বলা হয় জাতির মেরুদন্ড । যে জাতি যত বেশি শিক্ষিত, সে জাতি তত বেশি উন্নত। যে জাতি শিক্ষায় যত বেশি অগ্রসর, সে জাতি জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তিতে তত বেশি সমৃদ্ধ। তাই উন্নত দেশগুলির জনসংখ্যা প্রায় শতভাগ শিক্ষিত। উন্নত দেশগুলি শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে তাদের জাতীয় বাজেটে প্রচুর পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ রাখে।

এখানে লক্ষ্যনীয় বিষয়, যে সকল দেশ উন্নত ও সমৃদ্ধশালী তারা শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রচুর অর্থ বরাদ্দ রাখে। কারণ এসব দেশের টাকা-পয়সার কোন অভাব নেই। আবার অনেক অনুন্নত দেশ যেগুলিতে পরিচ্ছন্ন, জবাবদিহিমূলক ও জনকল্যাণমূলক সরকার আছে, এসব দেশও শিক্ষায় যথেষ্ট পরিমাণ অর্থ খরচ করে। শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ কি পরিমাণ অর্থ খরচ করে এর তুলনামূলক পরিসংখ্যান যাচাই করার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো মাথাপিছু শিক্ষা ব্যয় তুলে ধরা।

বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশ শিক্ষায় মাথাপিছু কি পরিমাণ অর্থ খরচ করে তা উপস্থাপন করলে আমাদের সামনে একটা হতাশাজনক চিত্র ভেসে ওঠে। ইউনেস্কো ১৯৭৫ সালকে ভিত্তি করে বিশ্বের ১৪0 টি দেশের ওপর শিক্ষা সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত দিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় বিশ্বের যে পাঁচটি দেশ জিডিপির সবচেয়ে কম অংশ শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যয় করে সেসব দেশের মধ্যে বাংলাদেশ দ্বিতীয় সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে । পরিসংখ্যানে দেখা যায় 140 টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের জিডিপির মাত্র ১.১% অর্থ ব্যয় করে ১৩৯ তম ও হাইতি ১.০% অর্থ ব্যয় করে ১৪০তম বা সর্বনিম্ন অবস্থান দখল করেছে।

বাংলাদেশের জন্য আরো হতাশাজনক চিত্র দেখা যায় ছাত্র প্রতি শিক্ষা ব্যয়ের পরিসংখ্যানে। দেখা যায় ছাত্র প্রতি শিক্ষা ব্যয়ে বিশ্বের 140 টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ  140তম বা সর্বনিম্ন স্তরে অবস্থান রয়েছে।

ক্রমিক নাম্বারদেশের নাম  ১৯৭৫ সালের ছাত্র প্রতি বার্ষিক ব্যয় (মার্কিন ডলার)
01ফিলিপাইন28 ডলার
02ভারত27 ডলার
03মায়ানমার14 ডলার
04হাইতি12 ডলার
05বাংলাদেশ10 ডলার

সূত্রঃ UNESCO, world education at a Glance  1987. 


১৯৭৫ থেকে ২০২৩, সময় চলে গেছে আর 48 বছর। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যয়ের অবস্থান কি ?

২০2৩ সালের বিশ্বব্যাংক পরিসংখ্যানে দেখা যায় বিশ্বের 217 টি দেশ ও অর্থনৈতিক ইউনিটের ( বিশেষ ভূখণ্ড)  মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান 200তম, বাংলাদেশের নিচে রয়েছে 17 টি দেশ ও উপরে 199 টি দেশ। এশিয়ার ৪৯ টি দেশের মধ্যে যে পাঁচটি দেশ মাথাপিছু শিক্ষায় সবচেয়ে কম অর্থ ব্যয় করে সেই গ্রুপে বাংলাদেশের অবস্থান করছে।

ক্রমিক নাম্বারদেশের নাম  2023 সালে মাথাপিছু বার্ষিক শিক্ষা ব্যয় (মার্কিন ডলার)
01বাংলাদেশ46 ডলার 
02পাকিস্থান27 ডলার 
03লাউস25 ডলার 
04মায়ানমার24 ডলার 
05আফগানিস্থান15 ডলার 

সূত্রঃ World Bank, world indicators database 2024.

তবে বাংলাদেশের এই ব্যয় নিয়েও প্রচুর বিতর্ক আছে। বাংলাদেশ বিশ্বের দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর রেড জোনে অবস্থান করছে। শিক্ষা খাতে ব্যয়কৃত অর্থের একটি অংশ দুর্নীতির মাধ্যমে হওয়া হয়ে যায়। সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয়েছে জনসংখ্যার প্রকৃত হিসাব নিয়ে। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ছয়টি আদমশুমারি বা জনশুমারি অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু শেষের তিনটি আদমশুমারিতে যথাক্রমে ২০০১,২০১১ এবং ২০২২ এ ব্যাপক অনিয়ম ও কারচুপি করা হয়েছে। এ নিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়  অভিযোগ আপত্তি উত্থাপন করা হয়েছে। আমাদের জাতীয় দৈনিক সমূহে আদমশুমারির অনিয়ম ও কারচুপি নিয়ে বিভিন্ন সময়য় একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। বিগত সরকারের রাষ্ট্রপতি, স্পীকার, কতিপয় মন্ত্রী ও এমপি আদমশুমারির ফলাফল নিয়ে দ্বিমত প্রকাশ করেছেন। এমনকি জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের সঙ্গেও সরকার জনসংখ্যার হিসাব নিয়ে বিরোধে জড়িয়ে পড়ে। সরকার জনসংখ্যা কম দেখিযয়ে ভুয়া হিসাবের মাধ্যমে মাথাপিছু আয় বাড়িয়ে দেখায়। এ ধরনের প্রক্রিয়া আত্মঘাতী ও দেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত-বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রবাসী জনসংখ্যা সহ ২০২৫ সালের মাঝামাঝি বাংলাদেশের জনসংখ্যা নিশ্চিত সাড়ে ২০ কোটি থেকে ২১ কোটিতে পৌঁছেছে। এমনকি তার চেয়েও কিছু বেশি হতে পারে। সুতরাং জনসংখ্যার সঠিক হিসাব বের করে মাথাপিছু আয়, মাথাপিছু শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যয়, মাথাপিছু খাদ্যের চাহিদা ও ভোগ ইত্যাদি জরুরী তথ্য নিরূপণ করা আবশ্যক।

পরিশেষে বলা যায় বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য শিক্ষা ক্ষেত্রে আরও অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হবে। এজন্য সবার আগে প্রয়োজন দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ ও দুর্নীতিমুক্ত সরকার। আর থাকতে হবে জনসংখ্যার নির্ভুল পরিসংখ্যান।

মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর কবির

লেখক ও গবেষক

তথ্যসূত্রঃ

1. UNESCO, world education at a glance 1987. 

2. world Bank, population, GDP and education database 2024. 

3. দৈনিক প্রথম আলো, ২৫ ডিসেম্বর ২০২৩, দুর্নীতির জালে ফেঁসে গেছে ২০০১ এর আদমশুমারি।

৪. দৈনিক প্রথম আলো, 05 মার্চ 2011, ২০১১ সালের শুমারি বাদ পড়বে ১০ লাখ আদিবাসী।

৫. দৈনিক জনকণ্ঠ, ২৩ মার্চ 2011, দায়সারা আদমশুমারি( সম্পাদকীয়)।

6. দৈনিক যুগান্তর, 21 এপ্রিল ২০১১, আদমশুমারিতে ব্যাপক অনিয়ম ও গুঁজামিল।

৭. দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৯ জুলাই ২০১১, জনসংখ্যা কম দেখিয়ে “মধ্য আয়ের দেশ” প্রদর্শনের চেষ্টা।

৮. দৈনিক ইনকিলাব, ৩১ জুলাই ২০২২, জনশুমারির তথ্য নিয়ে বিতর্ক।

9. বিবিসি নিউজ বাংলা,  0১ আগস্ট ২০২২, জনশুমারি নিয়ে খুশি নন বিবিসি বাংলার বেশ কজন ফেসবুক ফলোয়ার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *